মলিন মর্ম মুছায়ে- কান্তকবি রজনীকান্ত সেন স্মরণে

-

সময়টা বাংলা ভাগেরও প্রায় একশ বছর আগের। তখন ভিসার ঝঞ্ঝাট, অনিশ্চয়তা, এইসবের ধার ধারতে হত না বাঙালীকে। পাবনায় জন্ম নিয়ে, কোচবিহারের ইস্কুলে পড়তে কোন বাঁধা ছিলনা। রাজশাহী থেকে কলকাতায় এসে বাকী পড়াশুনো এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, এইসব এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম সেই সময়ে ছিল খুবই  স্বাভাবিক। এখন যেমন কলকাতায় আন্ডারগ্র্যাড, আবার দিল্লীতে পোস্ট গ্র্যাড, আবার হয়েত বেনারসে আরো উচ্চতর শিক্ষা করার চল, রজনীকান্ত সেনের সময় বাংলার উত্তর, দক্ষিণ , পূর্ব, পশ্চিমের – পথ, পাহাড়, নদী,  কোন কাঁটাতারে হোঁচট খেত না।

আজ থেকে একশ ছাপান্ন বছর আগে, ১৮৬৫ র ২৬শে জুলাই, কান্তকবির জন্ম হয় অখণ্ড বাংলার পাবনায়।গ্রামের নাম ভাঙাবাড়ি। তখনকার দিনে বেশীরভাগ বাবা, মা, এবং সমাজ বুঝতেন যে পড়াশুনোর পাঠের সাথে সাথে শিল্পের পাঠও কতখানি জরুরী। রজনীকান্ত সেনের পরিবার ও তার ব্যাতিক্রম নয়। বাবা গুরুপ্রসাদ সেনের  হাতেই সংগীতের পাঠ শুরু হয় রজনীকান্ত সেনের।

গুরুপ্রসাদ সেন নিজে ছিলেন সঙ্গীতজ্ঞ। কীর্তন নিয়ে তাঁর সংগ্রহের বিশেষ কাজ আছে। এই পরিবেশে বড় হন রজনীকান্ত সেন। পাঁচালী গান, রামপ্রসাদী, কীর্তনের সহজ সরল অথচ ভাবের পরিপূর্ণময় ব্যাপ্তি মনে হয় সেই ভাবেই ছুঁয়েছিল কান্তকবির গানগুলিকে। 

ভাবতে অবাক লাগে, রজনীকান্ত সেনকে কিন্তু পেশা হিসাবে গ্রহন করতে হয়েছিল ওকালতি। রাজশাহী কোর্টে রীতিমত প্র্যাকটিস করতেন। তবে মনটা ছিল গান, কবিতা, নাটকের ক্যানভাস। খুব ছোটবেলা থেকেই গান লিখতেন, গাইতেন। স্বভাব- কবি ছিলেন বলা চলে। অল্প বয়েস থেকেই তাঁর রচনা, মুগ্ধ করতে থাকে অনেক অনেক মানুষকে।

রজনীকান্ত সেন মূলত লিখেছেন এই তিন ধরণের গান – ভক্তিমূলক, দেশাত্মবোধক এবং হাস্যরসের গান। রচনার সংখ্যা যে প্রচুর, তা নয়। তবে আজ, তাঁর জন্মের দেড়শ বছরেরও বেশী সময় পরে, তার গান গুলি  কেমন অপার ভাবনার রসদ বুনে দেয় মনে।

বাংলায় অতুলপ্রসাদ সেন, রজনীকান্ত, সেন আর দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের নাম প্রায় এক নিঃশ্বাসে নেওয়া হয়। তবু রজনীকান্ত সেনের গান আমাকে সবচেয়ে বেশী কাছে টানে। সবচেয়ে বেশী ভাবায়। ওনার ভক্তিরসের গান গুলি সেই সময়ের নিরিখে ছিল ভিন্ন দর্শনবাহী এবং স্বতন্ত্র। ভাবের দিক থেকে, তা ছিল একদিকে কীর্তন, রামপ্রসাদ সেন, দাশুরায়ের প্রভাভাবমুক্ত, আবার সেই সময়ের প্রচলিত ব্রহ্মসংগীতের চিরাচরিত চেহারার থেকেও একেবারে আলাদা। বাংলায় ভক্তিরসের গানের অভাব নেই, তবে রজনীকান্ত সেনের মত আত্মসমর্পণ খুব কম গানেই পাওয়া যায়। এই গান গাওয়াই যেন উপাসনা হয়ে দাঁড়ায়।

আমার অন্যতমা গুরু শ্রীমতী গৌরী মিত্র, আমার পরম গৌরী দির কাছে আমি প্রথম শিখেছিলাম রজনীকান্তের এই গান। সেই দিন থেকে আজ অবধি একটা দিন এমন হয়েনি, যে গানটা  গেয়েছি, আর ভেতরটায় প্রচণ্ড কান্না টের পাইনি। শুনতে গিয়েও একই যন্ত্রণা – কি ভাবে একজনের কলম থেকে বেড়িয়ে পড়ে এইসব আকুতি –

“……ভাবি ছেড়ে গেছ, ফিরে চেয়ে দেখি,

এক পাও ছেড়ে যাও নি

আমি অকৃতী অধম বলেও তো

কিছু কম করে মোরে দাও নি

রজনীকান্তের গানে খুব বেশী কালোয়াতী খুঁজে পাওয়া যায়না। ধ্রুপদী রাগ তালেরও যে খুব প্রকট প্রভাব পাওয়া যায় এমনটা নয়। শুধুই নিখাদ সারল্য আর ভাবে পূর্ণ ছিল রজনীকান্ত সেনের গান। এই প্রসঙ্গে অবশ্য হাম্বীর রাগে রজনীকান্তের এই গানটির উপমা দেওয়ার লোভ সামলানো গেল না। রাগসংগীতের বড় সুন্দর প্রভাব রয়েছে এই গানটিতে, তবু গানের কথার জন্য ভাব কোথাও এতটুকু সরে যায়নি, –

“আকুল হয়ে মিছে

ভেবে মরি কত কি যে

….আমি দেখেছি জীবন ভরে চাহিয়া কত,

তুমি আমারে যা দাও সবই তোমারি মত”

রজনীকান্ত সেন হাস্যরসেরও কিছু গান রচনা করেন, তবে তা প্রায় সবই বিখ্যাত নাট্যকার, গীতিকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের অনুরোধে ও প্রভাবে।

সেটা ছিল স্বদেশীয়ানার যুগ। সবার চোখে ছিল নতুন ভোরের স্বপ্ন, আর প্রায় সব স্বদেশী গানে ছিল আগুন, তেজ, বীররস। সেখানে দাঁড়িয়ে একটু রজনীকান্ত সেনের দেশাত্মবোধক গানের কথাগুলো একটু ভাবা যাক। আবার সেই দেশপ্রেমের আবেগের স্তরের ওপর মমতার প্রগাঢ় প্রলেপ।

“….ঐ মোটা সুতোর সঙ্গে মায়ের অপার স্নেহ দেখতে পাই,

আমরা এমনি পাষাণ তাই ফেলে ওই, পরের দোরে ভিক্ষে চাই

সঙ্গীতের একটা ঘোর থাকে।সঙ্গীত সাধকেরা অনেকটা সময় বা প্রায় সব সময়টাই সেই ঘোরের মধ্যে নিজেদের আটকে রাখতে পারেন। তবে জাগতিক প্রয়োজনগুলো কেমন ধাক্কা দিয়ে ফিরিয়ে আনে তাদের অ-সুরের দুনিয়ায়। সারাজীবনই শুধুমাত্র সঙ্গীতের সেবা করে যাওয়া হয়ে ওঠেনি রজনীকান্তের। যখন সুযোগ হল তখনই পাড়ি দিতে হল অন্য পৃথিবীটায়। বড্ড অসময়ে ছুটি নিয়ে চলে যেতে হয় এই সাধককে।রচনার এমন ব্যাকুলতাই কি এত তাড়াতাড়ি পার করে দেয় নিরন্তরে….

“কবে তৃষিত এ মরু ছাড়িয়া যাইব

তোমারি রসাল নন্দনে”

Kantakabi Rajanikanta Sen

Share this article

Recent posts

Popular categories

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Recent comments